সাম্প্রদায়িক

১৪২৭

দিল্লীর জমায়েতের ঘটনা নিয়ে ভারতের মিডিয়া এবং বিজেপি-আরএসএস-বিশ্ব হিন্দু পরিষদ শিবির যে নোংরা খেলাটা খেললো, এবং বহু হিন্দু পরিচয়ের মানুষের করোনা আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে যে বিকৃত ও মিথ্যা সাম্প্রদায়িক প্রচারের বন্যা বইয়ে দিল, স্বাভাবিক ভাবেই তার তীব্র প্রতিক্রিয়া এল মুসলমান পরিচয়ের মানুষদের কাছ থেকে। এই করোনার মতো মারীর সময়েও এই নোংরা খেলা হতে পারে, এটা হয়তো তাদের অনেককেই স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। কিন্তু এই মুসলমান সমাজ আগের মতো মুখ বুজে চুপ করে মেনে নেওয়ার মানসিকতায় নেই। ক্যা-বিরোধী দেশজোড়া আন্দোলন তাদের আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করেছে। এবং ভারতের সাংবিধানিক অধিকার এবং গণতন্ত্রের অধিকারের হিস্যা বুঝে নিতে তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। দেশের সরকার ঐ জাগরণকে হিসেবে রেখেছিল না। এই আন্দোলনে পরিচয় নির্বিশেষে বহু গণতান্ত্রিক মানুষের যোগদান ভারতের হিন্দুত্ববাদী শিবিরকে বিচলিত করে তুলেছিল। তারা সুযোগ খুঁজছিলেন। সেই সুযোগ পেয়েই সাধারণ মানুষের করোনা আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে তারা ঐ ঐক্যকে ভাঙার খেলা শুরু করলেন।

এবং তার প্রতিবাদ এল তীব্রভাবে।

দেশের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের কথা বিন্দুমাত্র হিসেবে না রেখে মাত্র চারঘণ্টার নোটিশে যে দেশজোড়া ঘরবন্দী তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হল, যখন প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে যে শাসকরা গরীব মানুষের কথা, সে হিন্দু মুসলমান খ্রিশ্চান যাই হোক না কেন, ভাবে না, তখন সেই প্রশ্নকে ঘিরে এক বড় ঐক্য গড়ে ওঠাকে আটকে দিল ঐ সাম্প্রদায়িক প্রচার। এবং সেই প্রচারের পালটা জবাব দিতে গিয়ে নবজাগ্রত এই আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়া মুসলমান সমাজের অনেকেরই নজর সরে গেল, ফোকাস সরে গেল নতুন ঐক্য গড়ে তোলার এই সম্ভাবনার থেকে। এ দেশের অসংগঠিত, অস্থায়ী, স্থানান্তরী শ্রমিকদের বেশির ভাগটাই যে দলিত আদিবাসী এবং মুসলিম পরিচয়ের, সেই বোধের কথা মাথায় রইল না।

এই যে নতুন শক্তিবিন্যাস, এই যে একদিকে সুবিধাভোগী আরেকদিকে বঞ্চিত শ্রমিক, এর থেকে দৃষ্টি ঘুরে যাওয়ার আরেকটি কারণ হল লকডাউনকেই অনিবার্যতা হিসেবে মেনে নেওয়া। যখন আপনি বিশ্বাস করবেন যে লকডাউন ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই, যতক্ষণ না আপনি বিকল্প কোন রাস্তা দেখতে পাবেন, ততক্ষণ গরীব শ্রমজীবী মানুষের কষ্টে আপনি দুঃখ পাবেন ঠিকই, কিন্তু ঐ যে কী আর করা, এ ছাড়া উপায় কী! বিরোধী রাজনৈতিক দলের অবস্থাও এর চেয়ে খুব একটা আলাদা কিছু নয়।

সামনে এক ভয়াবহ মন্দা, বেকারীত্ব, ক্ষুধা আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। এখনকার অবস্থাকে সামাল দেওয়ার জন্য কিছু আধাখেঁচড়া ছাড় সরকার দেবে, কিন্তু বারবার দেখেছি আমরা যে সংকটের দায় কর্পোরেট এবং সম্পদশালীরা গরীবের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চায়, আর তার একাজে সহযোগী হয় দেশের সরকার। দুদিন পরে সেটাই ঘটবে। কাজের সময় ১২ ঘণ্টা করার প্রস্তাব, কর্মচারীদের বেতন বয়স্কদের পেনশন কেটে নেওয়া, স্বল্পসঞ্চয়ে সুদের হার কমিয়ে দেওয়া এর মধ্যেই ঘটে চলেছে। সবই হবে আর হচ্ছে করোনা সংকটের নাম করে।

ঠিক এই মুহুর্তেই ওদিকে গ্রেপ্তার হতে চলেছেন, হয়তো আম্বেদকরের জন্মদিনেই, দলিত সমাজকর্মী এবং অধ্যাপক আনন্দ তেলতুমব্রে, যিনি ঘটনাচক্রে আম্বেদকরের নাতজামাই। দু’বছর আগে ভীমা কোরেগাঁওতে লক্ষাধিক দলিত মানুষের জড়ো হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই গ্রেফতার। এই দলিতরা কি পরিচয়গতভাবে কম নিপীড়িত? এদের পাশে সহমর্মী হয়ে কি মুসলমান পরিচয়ের মানুষরা দাঁড়াবেন? তার জন্য তারা কি তৈরী? দলিতরাও কি তার জন্য তৈরী? আনন্দ তার খোলা চিঠিতে দেশবাসীকে লিখেছেন – “আমি চল্লাম এনআইএ-র হেফাজতে, জানি না কবে আবার আপনাদের সাথে কথা হবে। তবুও, আন্তরিক ভাবে আশা রাখি যে আপনাদের পালা আসার আগেই আপনারা মুখ খুলবেন।”

এই আত্মবিশ্বাসী মুসলমান পরিচয়ের মানুষদের একটি সচেতন অংশকে তার নিজস্ব সম্প্রদায়গত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠতেই হবে। শুধু মুসলমান পরিচয় দিয়ে একলা লড়াই করে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক আক্রমণকে ঠেকানো যাবে না, দলিতরা যতদিন এ সমাজে নিপীড়িত থাকবেন, যতদিন কোটি কোটি স্থানান্তরী মজুরদের কথা না ভেবে এ দেশের নীতি নির্ধারিত হবে, যতদিন আদিবাসীদের ওপর ঠিকেদার আর কর্পোরেটদের চূড়ান্ত শোষণ নিপীড়ন থাকবে, বুঝে নিতে হবে যে মুসলমান মানুষদের ওপর চলা বৈষম্য আর নিপীড়নও ততদিন দূর হবে না। দলিতদের মধ্যে সচেতন একটি অংশকেও একই কথাটা বুঝে নিতে হবে। বুঝতে হবে ব্রাহ্মণ্যবাদ আর মুসলমানবিরোধী সাম্প্রদায়িকতা একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ।

ক্যা-বিরোধী একের পর এক লেখা যখন লিখছিলাম, তখন এই ফেসবুকেই বহু মুসলিম পরিচয়ের তরুণ আমাকে বন্ধুত্বের রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছেন, গ্রহণও করেছি অনেক। তাদের ভরসাতেই এই কথাগুলো লিখলাম। আশা যে এই কথাগুলো তারা ভেবে দেখবেন। দলিত পরিচয়ের বন্ধুরা, গণতান্ত্রিক মানুষের কাছেও একই আশা রইল।

নতুন বাংলা বছর এক নতুন ঐক্যের সাক্ষী হোক্। শ্রেণীর ঐক্য, নিপীড়িত মানুষের ঐক্য, ভাষা সংস্কৃতি ধর্ম লিঙ্গগত নিপীড়ন আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক নতুন ভারতের, এক নতুন বাংলার ঐক্য।

নববর্ষের শুভেচ্ছা, ১ লা বৈশাখ, ১৪২৭

Design a site like this with WordPress.com
Get started